নয়ন যোসেফ গমেজ, সিএসসি
তপস্যাকাল: আশার তীর্থযাত্রায় আমাদের জীবন নবায়নের বসন্তকাল
খ্রিস্টেতে শ্রদ্ধাভাজন ও প্রিয়জনেরা, আজ গ-পূজন বর্ষের তপস্যাকালের প্রথম রবিবার। এছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা এখন রয়েছি মাণ্ডলীক জয়ন্তী বর্ষে। এই জয়ন্তী বর্ষে আমরা স্মরণ করছি, আশার তীর্থযাত্রী হয়ে আমরা এই জগতে জীবন যাপন করছি। আমাদের তীর্থ যাত্রা স্বর্গের দিকে; পিতা ঈশ্বরের সাথে মিলিত হওয়া আমাদের অভিষ্ট লক্ষ্য। গত বুধবার আমরা আমাদের কপালে ভষ্ম বা ছাই মেখে খ্রিস্টবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে আমাদের অনুতাপ ও দুর্বল স্বভাবের কথা চিন্তা করেছি। চিন্তা করেছি আমরা মাটির মানুষ; আমাদের দেহ নশ্বর কিন্তু আত্মা অমর। তপস্যাকলের এই পুণ্য সময়ে আমরা এক নতুন জীবন লাভের প্রত্যাশায় মন পরিবর্তন, অনুতাপ, প্রায়শ্চিত্ত, দয়ার কাজ ও প্রার্থনা দ্বারা নিজেদের নবায়িত করি। আর এর মধ্যে দিয়ে উপলদ্ধি করি আমাদের প্রতি পিতা ঈশ্বরের পরাক্রমশালী ভালবাসা।
আমাদের হৃদয় ও মন পরিবর্তন করে পিতা ঈশ^রের সাথে আমাদের সম্পর্ক-উন্নয়ন করতে খ্রিস্টমণ্ডলীতে তপস্যাকালের গুরুত্ব অপরিসীম। এই সময়টাতে আমরা আমাদের দেহ, মন ও আত্মায় এক নতুন ও নবায়িত শক্তি লাভ করি। যে শক্তির বিষয়ে নিস্তার রজনীর জগরণী বন্দনাতে বলা হয়: “এই শক্তি সমস্ত দুষ্কর্ম দূর করে, সমস্ত পাপ বিধৌত করে; পতিত মানুষকে নির্মল ক’রে তোলে, দুঃখ-ক্লিষ্টকে ফিরিয়ে দেয় আনন্দ, সকল হিংসা-বিদ্বেষ বিতাড়িত ক’রে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে, চূর্ণ করে আমাদের অহংকার।” তপস্যাকাল হলো আমাদের মণ্ডলী তথা আমাদের খ্রিস্টিয় জীবনের ‘বসন্তকাল”। প্রকৃতিতে আমরা দেখি, শীতের পরেই আসে বসন্তকাল। আর শীতের সময় প্রকৃতিতে যে মুমূর্ষু অবস্থা বিরাজ ক’রে, বসন্ত আসার পর তা আবার যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। একই ভাবে তপস্যকাল আমাদের আধ্যাত্মিক নবজন্মের সময়। পিতা ঈশ^রের সাথে আমাদের সম্পর্ককে যা কিছু বিচ্ছিন্ন করতে চায়, তা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এবং যা কিছু সেই সম্পর্ককে মজবুত করে তা আঁকড়ে ধরার সময়। তপস্যাকালে এই কাজটি যথাযতভাবে করতে পারলেই সার্থক ও ফলপ্রসূ হয়ে উঠবে আমাদের নিস্তার মহোৎসব তথা পুনরুত্থান উদযাপন।
আজকের প্রথম পাঠে, দ্বিতীয় বিবরণ পুস্তকে আমরা ঈশ^রের প্রতি তাঁর যথাযত ভালবাসা ও ভক্তি প্রদর্শনের বিষয়ে শুনেছি। প্রথম পাঠের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখতে পাই, ইস্রায়েলীয়দের সেই সুদীর্ঘ ৪০ বছরের মরুযাত্রা শেষ হওয়ার পর তারা এখন জর্ডন নদীর তীরে এসে পৌঁছেছে। তাদের সামনে নদীর ওপারে দেখা যাচ্ছে তাদের গন্তব্য স্থান সেই দুগ্ধ ও মধু প্রবাতি সেই কানান দেশ। মোশী মরুযাত্রার প্রধান প্রধান নানা ঘটনার কথা ইস্রায়েলীয়দের মনে করিয়ে দিয়ে এই কথা সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, সেই সব ঘটনায় ইস্রায়েলীয়দের প্রতি ঈশ্বরের অতি রহস্যময় ভালবাসা প্রকাশ পেয়েছে। যদিও ইস্রায়েলীয়রা ঈশ্বরের তেমন ভালবাসার পাত্র হওয়ার যোগ্য ছিল না। এই বিষয়ে মোশী স্পষ্টই বলেছেন, “তোমরা ধার্মিক মানুষ ব’লেই যে তোমাদের ঈশ্বর ভগবান ঐ দুগ্ধ-মধু প্রবাহিত দেশটি তোমাদের দিয়েছেন, মোটেই তা নয়! আসলে তোমরা তো জেদী একজাতির মানুষ… তোমরা তো বারবার ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ক’রেই এসেছ” (২য় বিব ৯:৬-৭)! তবু ঈশ্বর তাদের যত স্খলন ক্ষমা ক’রে প্রয়োজন মতো তাদের রক্ষা করেছেন, পথ দেখিয়েছেন, পুষ্ট করেছেন, ধর্মশিক্ষা দিয়েছেন এবং আশিসধন্য করেছেন; কারণ ঈশ্বর তাদের ভালবাসেন। মোশীর এই সব কথা ইস্রায়েলীয়দের স্মরণ করিয়ে দেবার উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে এই বিষয়ে গভীর ভাবে সচেতন ক’রে তোলা যে, যিনি তাদের এতই ভালবেসেছেন, তাঁর প্রতি তাদেরও কর্তব্য, তাঁকে মনে-প্রাণে ভালবাসা, সব ব্যাপারে তাঁর ইচ্ছা মতো কাজ ক’রে চলা। মোশী আজ হৃদয়স্পর্ষী ভাষায় আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন তা-ই করে। কেননা ঈশ্বর তাদের সঙ্গে যে সন্ধি বন্ধনে নিজেকে আবদ্ধ ক’রে রেখেছেন, সেই বন্ধন পিতৃসুলভ ভালবাসারই বন্ধন।
আজকের দ্বিতীয় পাঠে, রোমীয়দের কাছে ধর্মপ্রত্রের মধ্য দিয়ে সাধু পল আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, পবিত্রতা বা ধার্মিকতা লাভের পথ অসম্ভব কোন সাধনার পথ নয়। আমাদের পরিত্রাণের জন্য যা কিছু করার কথা, প্রভু যিশু খ্রিস্ট তা সবই সম্পন্ন করেছেন। তাই এখন আমাদের যা করতে হবে তা হলো, গভীর ভক্তি ও বিশ্বাস নিয়ে প্রভু যিশু খ্রিস্টকে আমাদের হৃদয়ে বরণ করে নেওয়া এবং সেই বিশ্বাসের প্রেরণা অনুযায়ী প্রতিদিন জীবন যাপন করা। আজকের দ্বিতীয় পাঠে সাধু পল বলেন, “যারা তাঁকে ডাকে তাদের সকলের প্রতি সমান তাঁর বদান্যতা।” এই কথা থেকে আমরা বুঝতে পারি, প্রভু যিশু খ্রিস্টের মধ্য দিয়ে পিতা ঈশ্বর আমাদের প্রত্যেককে সমানভাবে ভালবেসেছেন। ঈশ্বরের চোখে ছোট-বড় ব’লে কোন কিছু নেই; সবল-দুর্বল সবাইকেই ঈশ্বর সমান ভালবাসেন। আমাদের প্রতি তাঁর ভালবাসার কথা তিনি প্রাক্তন সন্ধিতে পিতৃগণ ও প্রবক্তাদের মধ্য দিয়ে এবং নব সন্ধিতে নিজ পুত্রের মধ্য আমাদের কাছে প্রকাশ করেই থেমে থাকেননি! তিনি নিজ পুত্রকে আমাদের জন্য বিসর্জন দিয়ে; চরম অপমান, যন্ত্রণা, মৃত্যু ও পুনরুত্থান করিয়ে তিনি আমাদের দেখিয়েছেন তাঁর ভালবাসা কত অসীম, কত বিশাল। তাই আমাদেরকেও প্রতিদিনকার জীবনে পিতা ঈশ্বরের বাণীর আদর্শে কথা ও কাজে এক হতে হবে। আমরা যে বিশ্বাসে বিশ্বাসী সেই বিশ্বাস আমাদের কর্মে প্রকাশ করতে হবে। সেই বিশ্বাসকে আমাদের জীবনে জীবন্ত ক’রে রাখতে হবে। আমাদের চিন্তা, কথা ও কাজে এক হতে হবে।
আজকের পবিত্র মঙ্গলসমাচারে, প্রভু যিশুর কর্মজীবনের আরম্ভে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা লক্ষ্য করি- যিশুর দীক্ষাস্থান এবং মরু প্রান্তরে তাঁর ধর্মনিষ্ঠার পরীক্ষা। এই দু’টি ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা প্রভু যিশুর প্রকৃত পরিচয় পাই। আমরা জানি, দীক্ষাস্থানের সময় যিশু ঈশ্বর-পুত্র বলে পরিচিত হন অর্থাৎ তাঁর ঈশ্বরত্ব প্রকাশ করেন। অন্যদিকে মরু-প্রান্তরে তিনি তাঁর মানবসত্ত্বা আমাদের সামনে খুব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। ইহুদি জাতি যুগের পর যুগ ধরে ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত মশীহের প্রতিক্ষায় ছিল। তবে মশীহের সম্বন্ধে তাদের ধারণা ছিল ভুল ও অস্পষ্ট। অনেকে মনে করেছিল যে, মশীহ এসে নিজ ক্ষমতায় আশ্চর্যজনকভাবে তাঁর জাতির রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনবেন। আবার অনেকে মনে করেছিল যে, মশীহ ঐশরিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে মানুষের সামনে এসে ভয়ানক বিভিন্ন নিদর্শন দ্বারা ঈশ্বরের ক্রোধ ও বিচারের দিন ঘোষণা করে মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের গৌরবময় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবেন। সেই রাজ্যে কেবল মোশীর আইন পালনকারী ইস্রায়েল জাতি স্থান পাবে আর অন্যান্য জাতি তা থেকে বঞ্চিত থাকবে। প্রভু যিশু জানেন যে, তিনিই সেই প্রতিশ্রুত ও প্রতীক্ষিত মুক্তিদাতা। এই সত্য তাঁর দীক্ষাস্থানে প্রমাণিত হয়েছে। এখন তাঁর জাতির মানুষের ভুল ধারণা ও আশা তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে। তারা তাঁর কাছ থেকে যা চায় তা পিতা ঈশ্বরের পরিকল্পনা নয়। সুতরাং তিনি স্থির করেন যে, তিনি মানুষের মনের মত নয় বরং ঈশ্বরের পরিকল্পনা অনুযায়ী মশীহের ভূমিকা পালন করবেন।
পবিত্র মঙ্গলসমাচারে আমরা দেখি, যিশু পবিত্র আত্মা দ্বারা মরুপ্রান্তরে পরিচালিত হন। এর পরও শয়তান এসে যিশুকে পরীক্ষা করে। এই ধর্মনিষ্ঠার পরীক্ষায় যিশু বুঝতে পারেন ঈশ্বরের পুত্র হওয়ার প্রকৃত ও দাবি অর্থ কি এবং তিনি সেই ভাবেই পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ঈশ্বরের পুত্র বলে প্রমাণিত হওয়ার জন্য শয়তান তিনটি পরীক্ষা ও প্রলোভন নিয়ে যিশুর সামনে উপস্থিত হন- ১. (Power) ক্ষমতা প্রয়োগ করা বা ক্ষমতাবান হওয়ার প্রলোভন। ২. (Position) সমস্ত জাগতিক ধন-সম্পত্তির অধিকারী হওয়া এবং কর্তৃত্ব বা রাজত্ব করা। ৩. (Popularity) নিজেকে জাহির ক’রে জনপ্রিয় বা বিখ্যাত হওয়া। শয়তান যীশুর সামনে আসে তাঁরই প্রকৃত পরিচয় ধরে, “তুমি যদি ঈশ্বরের পুত্র হও…” এই কথা দ্বারা। এখানে যিশু নিজে জানেন তিনি ঈশ্বরের পুত্র এবং শয়তানও তা ভাল ভাবেই জানেন যিশু আসলে কে! প্রভু যিশু শয়তানের এই তিনটি প্রলোভনের প্রত্যেকটিই প্রত্যাখান করেন ঈশ্বরের-ই বাণীর আলোকে। তিনি প্রতিটি প্রলোভনের পরপর যে শাস্ত্র-বাণীগুলো উল্লেখ করেছিলেন তা দ্বিতীয় বিবরণ পুস্তক থেকে (৮:৩; ৬:১৩; ৬:১৬) চয়ন করা। এই তিনটি বাণীরও প্রেক্ষাপট রয়েছে। মরুপ্রান্তরে ঈশ্বরের প্রথমজাত সন্তান ‘ইস্রায়েল জাতি’ যখন ঈশ^রকে ভুলে নানা মন্দতায় জীবন যাপন করছিল; তখন তিনি এই বাণীগুলোর আলোকে মোশীর মধ্য দিয়ে তাদের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরেছেন।
আজ যিশু নিজেও সেই একই বাণী স্মরণ করে নিজের প্রকৃত প্ররিচয় আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি কখনো তাঁর নিজের ক্ষমতা ও ইচ্ছা অনযায়ী জীবন-যাপন করেননি। এই বিষয়ে সাধু পল বলেন, “স্বরূপে ঈশ্বর হয়েও তিনি ঈশ্বরের সঙ্গে তাঁর সমতুল্যতাকে আঁকড়ে থাকতে চাইলেন না; বরং দাসের মতো তিনি নিজেকে রিক্ত করলেন। আকারে-প্রকারে মানুষ হয়ে তিনি মৃত্যু পর্যন্ত, এমনকি ক্রুশীয় মৃত্যু পর্যন্ত নিজেকে বাধ্য ও অবনমিত করলেন। আর এই জন্য ঈশ্বর তাঁকে উন্নীত করলেন এবং তাঁকে দিলেন সেই নাম, সকল নামের শেষ্ঠ যে নাম” (ফিলি ২:৬-৯)। এখানে আরেকটি বিষয় আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, যিশুকে পবিত্র আত্মা কেন মরু-প্রান্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন ? এর প্রেক্ষাপটে আমরা দেখি, প্রাক্তন ইস্রায়েল জাতি মরু-প্রান্তরে ৪০ বছর ধরে যাত্রা করার সময় বিভিন্ন প্রলোভন ও পরীক্ষায় পতিত হয়েছে; এদিকে নতুন ইস্রায়েল যিশু খ্রিস্ট ৪০ দিন ও রাত মরুপ্রান্তরে থেকে সকল প্রলোভন ও পরীক্ষা থেকে উত্তীর্ণ হয়েছেন। মঙ্গলসমাচারের শেষ দিকে আমরা শুনেছি, “প্রলোভন দেখানোর আর কোন উপায় বাকি না থাকায় শয়তান যিশুকে ছেড়ে চলে গেল। উপযুক্ত সুযোগ না আসা পর্যন্ত সে দূরেই রইল।” এই থেকে আমরা বুঝতে পারি, শয়তান কখনো হাল ছেড়ে দেয় না। শয়তান বারবার যিশুকে পরীক্ষা ও প্রলোভন দেখিয়েছে কারণ তিনি সর্বদা পবিত্র আত্মায় পরিপূর্ণ, সর্বদা পবিত্র আত্মার দ্বারা পরিচালিত এবং সবকিছুতে পিতা ঈশ্বরের ইচ্ছা ও পরিকল্পনা মেনে চলতেন।
আমাদের জীবনেও প্রতিনিয়ত প্রলোভন আসে। শয়তান ঈশ্বর-পুত্র যিশুকে পরীক্ষা করতে ছাড়েনি আর আমরা সাধারণ মানুষ। স্বভাবে দুর্বল আমরা। আমরা অতি সহজেই শয়তানের পরীক্ষায় পড়ে যাই। এর কারণ আমরা সব সময় নিজের বাইরে শয়তানের অবস্থান দেখার চেষ্টা করি। আসলে শয়তান থাকে আমাদের অন্তরে। যিশু বলেন, “আমি তোমাদের বারো জনকেই বেছে নিয়েছি! তবুও তোমাদের মধ্যে একজন শয়তান” ( যোহন ৬:৭১)। যিশু পিতরকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, “আমরা সামনে থেকে দূও হও শয়তান” (মার্ক ৮:৩৩)। সাধু যাকোব বলেন, “প্রতিটি মানুষ নিজের কামনা বাসনায় আকর্ষিত ও প্রবঞ্চিত হওয়ার ফলেই শয়তানের পরীক্ষা ও প্রলোভনের সম্মুখিন হয়; এরপর সেই প্রলোভন গর্ভস্থ হয়ে পাপ প্রসব করে আর সেই পাপ জন্ম দেয় মৃত্যুর” (যাকোব ১:১৪-১৫)। প্রভু যিশুর আদর্শ অনুসরণে আমাদের সামনেও রয়েছে তপস্যাকালের ৪০ দিন। এই ৪০ দিন আমরা প্রভু যিশুর জীবন ও কাজ ধ্যান ক’রে, মঙ্গলবাণী পাঠ ক’রে, প্রার্থনা ও ক্রুশের পথ ধরে দয়ার কাজ ক’রে জীবন পরিবর্তন করতে এবং নতুন মানুষ হতে প্রত্যেকেই সুযোগ ও সময় পাই। মঙ্গলবাণী আমাদেরকে মুক্তির পথে পরিচালিত করে।
তপস্যাকালে প্রভু যিশুর যাতনাভোগ স্মরণ ও ধ্যান আমাদের জন্য এক বড় শক্তি। তাই প্রত্যেক তপস্যাকালে সকল খ্রিস্টভক্তকে আমন্ত্রণ জানানো হয় নিজ নিজ জীবনে, পরিবারে ও সমাজে অবিরাম যিশু খ্রিস্টকে অনুসরণ করতে। তপস্যাকালের শুরুতে নিজেদের অসচেতনতার জন্যে অনুতপ্ত হওয়া ও নিজেদেরকে পরিবর্তন করা এবং কৃচ্ছসাধনের মধ্য দিয়ে নতুন মানুষ হয়ে ঈশ্বরের কাছে ফিরে আসার সময়। ঈশ্বর সব সময় চান ও অপেক্ষায় থাকেন আমরা যেন ভুল পথে গেলেও পুনরায় তাঁর পথে ফিরে আসি। ঈশ্বর দয়ালু, তিনি প্রতিশোধ নেন না, তিনি মানুষকে ভালবাসেন। তারই প্রমাণস্বরূপ অদ্বিতীয় আপন পুত্রকে তিনি দান করেছেন আমাদেরই মুক্তির জন্যে। আমরা পাপ করে ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে সরে যাই। তাই আমাদেরই দায়িত্ব নিজেদেরকে পাপী বলে স্বীকার করা এবং বিশ্বাস ভরে পাপের জন্য ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চাওয়া। ঈশ্বরের কাছে ফিরে আসা ও তাঁর সান্নিধ্য লাভের জন্য তপস্যাকাল আমাদের সামনে তিনটি উপায় রেখেছে। সেই সান্নিধ্য লাভের জন্য আমাদের একনিষ্ঠভাবে প্রার্থনা, উপবাস বা আত্ম-সংযম এবং ভিক্ষাদান বা দয়ার কাজ করতে হবে। এই তিনটি তপস্যামূলক ক্রিয়া পালন করলে আমরা জীবনকে নতুনরূপে সাজাতে ও প্রকাশ করতে পারব।
একনিষ্ঠ প্রার্থনা ও মন পরিবর্তন: প্রভু যিশুর সান্নিধ্য লাভের মূলমন্ত্র হলো অনবরত মন পরিবর্তন ও প্রার্থনা। কেননা এর মাধ্যমে আমরা যিশুর উপস্থিতি আমাদের অন্তরে উপলদ্ধি করি। প্রার্থনা শুধু মুখের ভাষা নয়; এটি একটি আত্মিক সম্পর্ক, প্রেমপূর্ণ সংলাপ এবং কায়মনোবাক্যে ঈশ্বরের সাথে মিলিত হওয়া। প্রার্থনা আমাদের জীবনে দান করে সত্য দৃষ্টি ও সঠিক মূল্যবোধ। সাধু আগষ্টিন বলেন, “যারা প্রার্থনা করতে শেখেন, তারা জীবনযাপনও করতে শেখেন।” প্রার্থনাকে আমরা দুইভাবে বিবেচনা করতে পারি; প্রথমত, ধ্যান-প্রার্থনার মাধ্যমে আমরা ঈশ্বরের ও ভাইবোনদের কথা স্মরণ করতে করতে আমাদের অন্তরের সমস্ত হিংসা, ঘৃণা ও অহংকার অমঙ্গল চিন্তা দূর করার শক্তি লাভ করি, ধীরে ধীরে সেগুলো ত্যাগ করি। তাতে আমাদের অন্তরের চিন্তা ও কথা মার্জিত, পরিশুদ্ধ, পরিচ্ছন্ন এবং পবিত্র হতে থাকে। দ্বিতীয়ত, প্রার্থনার মাধ্যমে ঈশ্বর ও মানুষের সাথে অন্তরে একাত্ম হওয়া। আমরা প্রায়শই ঈশ্বর ও মানুষের সাথে এক হওয়ার কথা ভাবি। তবে নিজের অনেক কিছু পরিত্যাগ করতে না পারলে, ঈশ্বর ও মানুষের সাথে অন্তরে একাত্ম হওয়া অনেক কঠিন। সেখানে নিজের দিক থেকে যথেষ্ট ত্যাগের প্রয়োজন আছে। কেননা আত্মত্যাগী হৃদয়ই প্রার্থনাশীল হৃদয়। আর প্রার্থনাশীল হৃদয় ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য সর্বদা ব্যাকুল।
আত্মসংযম বা উপবাস: মহাচার্য সাধু বাসিল বলেন, “উপবাস করার আদেশ হল স্বর্গ-উদ্যানবাসী আদি মানুষের কাছে ঈশ্বরের প্রথম আদেশ। ঈশ্বর যখন আদমকে বলেছিলেন, তুমি কিন্তু মাঝখানের ‘ভাল-মন্দ’ গাছের ফল খাবে না! কোনদিন তা খেলে মরবেই মরবে। আর এখান থেকে বুঝা যায় যে, ঈশ্বর স্বর্গোদ্যানবাসী মানুষকে প্রথম বারের মতো উপবাস ও তপস্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন।” আমরা যেহেতু সকলে পাপে ভারাক্রান্ত সেহেতু আমাদের জন্য উপবাস করা হল ঈশ্বরের দেওয়া এমন এক উপায় যা নিয়ে আমরা ঈশ্বরের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়তে পারি। পবিত্র বাইবেলের প্রাক্তন সন্ধিতে, বিভিন্ন সময়ে প্রবক্তারা ইস্রায়েল জাতিকে কোন কাজ করার আগে উপবাস করার আদেশ দিতেন। নবসন্ধিতে প্রভু যিশু খ্রিস্ট নিজেই চল্লিশ দিন মরুভূমিতে উপবাস পালন করেছিলেন। শিষ্যচরিত গ্রন্থেও এই কথা বলা হয়েছে যে, প্রথম সারির খ্রিস্টবিশ্বাসীরা বার বার উপবাস পালন করত। পরে মণ্ডলীর মহাচার্য ও পিতৃগণও এই শিক্ষা দিয়েছেন, উপবাস পালনের মধ্যে শক্তি রয়েছে; যা পাপকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ঈশ্বরের কাছে যাবার পথ উন্মুক্ত করে। প্রতিটি যুগের সাধু-সাধ্বীরাও নিজেরা উপবাস পালন করতেন এবং অন্যান্যদেরকেও তা করতে উৎসাহ দিতেন। চতুর্থ শতাব্দীর মহাচার্য সাধু পিতর খ্রীসোলোগ লিখেছেন, “উপবাস হল প্রার্থনা প্রাণ। তাই তোমরা যদি সার্থক প্রার্থনা করতে চাত্ত, তবে উপবাস কর।” উপবাস হল অন্তরের পবিত্রতা। উপবাস হল দুঃস্থ দুর্বলদের সহায় হওয়া আর লোভ, কাম, ক্রোধ, শোষণ, ভাওতাবাজিতা, পক্ষপাতিত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে দূরে থাকা। উপবাস কেবল না খেয়ে থেকে বা খাওয়া দাওয়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা নয় বরং উপবাস হৃদয় পরিবর্তনের ব্যাপার।
নিঃস্বার্থভাবে ভিক্ষাদান ও দয়ার কাজ: ভিক্ষাদান বা দয়া হল উপবাসের জীবন-রস। মন্দতার প্রভাব থেকে মুক্তি লাভের অন্যতম উপায় হল দয়া। যাদের প্রতি ভালবাসা দেখানো ব্যাপরে আমরা দূরে থাকি; দয়ার কাজ দ্বারা আমরা তাদের কাছে যেতে পারি। আসলে আমরা যখন অন্যকে কোন কিছু দান করি, তখন আমাদের অবশিষ্ট কোন কিছু তাকে দান করি না বরং যা দিয়েছি তা তার প্রাপ্য ছিল। এই জগতে কোন কিছুই আমাদের নিজের নয়। নিজেকে নিয়ে, নিজের জীবনকে নিয়ে, নিজের কাজকে নিয়ে আমরা কত বাহাদুরি করি; অথচ এর কোনটাই আমাদের নিজের নয়। আমরা নিজেরাও নিজের নয়।
খ্রিস্টেতে প্রিয়জনেরা, তপস্যাকালে উপবাস বা রোজা রাখার জন্য আমি যদি কেবল না খেয়ে থাকি কিন্তু আমার জীবন-যাপন ও আচার-ব্যবহার যদি সুন্দর না হয়; তবে কোন মূল্য নেই সেই না খেয়ে থাকার। তখন সেই না খেয়ে থাকা কোন পুণ্যকর্ম না হয়ে, হয়ে ওঠে কৃপণতা ও ভণ্ডামি! উপবাস ও আত্ম-সংযম আমাদের সমস্ত জীবনটা সুশৃঙ্খলিত করে। তাই আসুন শুধু খাবার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করেই নয় বরং আমাদের ভিতরের সঞ্চিত সমস্ত রাগ, ক্রোধ ও ঘৃণার মনোভাব পোষণ না করার তপস্যা করি। ভুল-ত্রুটির ক্ষেত্রে নিজের দিকে না তাকিয়ে সবকিছুতে কেবল অন্যের দোষারোপ ও বিচার না করার ক্ষেত্রে তপস্যা করি। জীবনের হতাশ ও নিরুৎসাহী না থাকার তপস্যা করি। সকল প্রকার অভিযোগ থেকে বিরত থাকার তপস্যা করি। সকল অপমান, অসন্তুষ্টি ও তিক্ততা থেকে বের হয়ে আসার তপস্যা করি। যারা বিগত জীবনে আঘাত বা কষ্ট দিয়েছে তাদেরকে ক্ষমা সুন্দর মনোভাব নিয়ে গ্রহণ করার তপস্যা করি। সকল প্রকার অপচয় থেকে বের হয়ে এসে নিঃস্বার্থভাবে দীনদরিদ্র ভাই বোনদের সাহায্য করার তপস্যা করি। তপস্যাকালে আমরা যদি এভাবে তপস্যা করি, তাহলে ঐশরাজ্যের তীর্থযাত্রায় আমরা আমাদের জীবনকে নবায়িত ক’রে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ ও ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হওয়ার আনন্দ প্রকৃতরূপে উপভোগ করতে পারব।