পাপ থেকে মন ফেরাও

গত ৫ মার্চ ভস্মবুধবার কপালে ভস্ম বা ছাই মেখে আমরা প্রায়শ্চিত্তকাল বা উপবাসকাল আরম্ভ করেছি। সেইদিন ভস্ম দিয়ে আমাদের কপালে ক্রুশচিহ্ন একে দিয়ে যাজক আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, “হে মানব, স্মরণ কর তুমি ধূলিমাত্র, আবার ধূলিতেই মিশে যাবে”। এই কথা তো খুবই সত্য- কারণ আমরা তো কেউ চিরকাল জীবিত থাকব না! জন্ম হলে একদিন মৃত্যু হবে- এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম বা জাগতিক নিয়ম। এতেই আমরা বুঝতে পারি প্রায়শ্চিত্তকালের আসল অর্থ কি আর এই প্রায়শ্চিত্তকাল আমাদের কাছে কিসের আহ্বান জানায়। প্রায়শ্চিত্তকাল আসলে আমাদের আহ্বান জানায় যেন আমরা পাপ থেকে মন ফেরাই; আমরা যেন পাপের পথ ত্যাগ করে পবিত্রতার পথে ফিরে আসি। এই সময়টি হলো ৪০ দিনব্যাপী প্রার্থনা, উপবাস ও ভিক্ষাদান করার মধ্য দিয়ে আত্মশুদ্ধির সময়। এই সময় হলো অনুধ্যান ও অনুতাপ করার সময়। আমরা আমাদের পাপের ক্ষতিপূরণের জন্য সত্যিকারের ত্যাগস্বীকার ও অনুতাপ করে নিজেদের প্রস্তুত করি যেন যিশুর পুনরুত্থানের সহভাগী হতে পারি। এই সময় আমরা আমাদের আধ্যাত্মিক নবায়ন করার সুযোগ পেয়ে থাকি।

প্রায়শ্চিত্তকাল হলো প্রথমত: প্রার্থনা ও অনুধ্যানের সময়। এই সময়টি হলো জেগে থাকা, অপেক্ষা করা ও আশা করার সময়। রাত্রির অন্ধকার কেটে আবার ভোরের আলো ফুটবে এই আশা যেমন আমরা করি, তেমনি আমরা আশা করি যে পাপের অন্ধকার পেরিয়ে আমাদের জীবনে পরিত্রাণের আলো ফুটবে। তবে প্রার্থনা আমরা লোক দেখানোর জন্য যেন না করি। এই বিষয়ে যিশুর নির্দেশ হলো, “তোমরা যখন প্রার্থনা করো, তখন তোমার ঘরে যাও এবং দরজা বন্ধ করে প্রার্থনা করো” (মথি ৬:৬-৭)। আমরা যদি লোক দেখানো ও মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য প্রকাশ্যে প্রার্থনা করি, তাহলে ঈশ^রের কাছ থেকে কি পুরষ্কার আমরা আশা করতে পারি? বরং আমরা যেন ঈশ্বরের কাছ থেকে পুরষ্কার পাই আমাদের কি সেই চেষ্টা করা উচিত নয়? এইবারের উপবাসকালে আসুন আমরা প্রার্থনা করি পরিবারের সকলের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে ও গির্জায় সংস্কারীয় অনুষ্ঠানে আর খ্রিস্টযাগে এবং একাকী নিভৃতে ও সকল বিশ্বাসীর সঙ্গে মিলে। এই সময় আমরা প্রার্থনা ও ধ্যান করব প্রতিদিন নিরবিচ্ছিন্নভাবে। ঈশ্বরকে পাওয়ার আশায় আমরা প্রার্থনায় জাগ্রত হয়ে থাকব।

এই সময়টি উপবাসের সময়। তবে আমরা লোক দেখানোর জন্য নয় বরং আমাদের পাপের জন্য অনুতাপ ও প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য উপবাস করব। রোমান কাথলিক মণ্ডলীর আইন অনুসারে ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সের সকল খ্রিস্টভক্তকে রোজা বা উপবাস থাকতে হয়; আর ১৪ বছর বয়স থেকে সকলেই মাংসাহার ত্যাগ করবে। তবে ১৫ বছর বয়সেও উপবাস করা সম্ভব। আবার যদি কেউ অসুস্থ থাকে, তাহলে উপবাস রাখার বাধ্যবাদকতা নেই। মাংসাহার বিষয়ে বাংলাদেশের কাথলিক বিশপ সম্মিলনীর নির্দেশনা হচ্ছে, নিরামিষ ভোজন করা। তবে কাথলিক মণ্ডলী শুধু পুণ্য শুক্রবার ছাড়া, উপবাসের নিয়ম শিথিল করে খ্রিস্টভক্তদের স্বাধীন ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়েছে; কিন্তু তা বাতিল করেনি। তার কারণ হলো যে প্রায়শ্চিত্ত বা ত্যাগস্বীকার করার একমাত্র উপায় শুধু উপবাস নয়। পাপের জন্য প্রায়শ্চিত্ত ও ত্যাগস্বীকার করার জন্য আমরা অন্য যে কোন ধরণের ত্যাগস্বীকারের কাজ করতে পারি। তবে তা যেন লোক দেখানো বা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য না হয়। যিশু বলেছেন, “তোমরা যখন উপোস কর, তখন ভণ্ডদের মতো বিষন্ন ভাব দেখিয়ো না। যখন তুমি উপোস কর, তুমি বরং তখন মাথায় তেল মেখো, চোখমুখ ধুয়ো, যাতে তুমি যে উপোস করছ, মানুষ যেন তা জানতে না পারে, যেন জানতে পারেন শুধু তোমার পিতা, সেই গোপনেই থাকেন যিনি। তিনি তোমাকে পুরস্কৃত করবেন” (মথি ৬: ১৬-১৮)।

প্রায়শ্চিত্তকাল হলো ভিক্ষাদান ও দয়ার কাজ করার সময়। আমরা উপবাস ও অন্যান্য ত্যাগস্বীকার করে যা সঞ্চয় করি, তা আমাদের ভোগ বা উপভোগ করার জন্য নয়; বরং তা ঈশর আর আমাদের অভাবী ভাইবোনদের জন্য। আমাদের ভিক্ষাদান বা দয়ার কাজ হতে হবে গোপন, কারণ ভণ্ডরাই লোক দেখানোর জন্য বা মানুষের প্রশংসা পাবার জন্য  প্রকাশ্যে ভিক্ষাদান বা দয়ার কাজ করে। “তোমার এই ভিক্ষাদান বরং গোপনই থাকুক! তাহলে তোমার পিতা, যিনি গোপন সব-কিছু দেখতে পান, তিনি তোমাকে পুরস্কৃত করবেন” (মথি ৬: ৪)। সমাজে আমাদের অনেক অভাবী, বঞ্চিত-নিপীড়িত, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক মানুষ আছে, যাদের প্রতি আমরা বিস্মৃত হয়ে থাকি, তাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা আমাদের খ্রিস্টিয় দায়িত্ব। প্রায়শ্চিত্তকাল হলো সেই দায়িত্ব আরও বেশী করে পালন করার সময়।

আমরা প্রার্থনা বা অধ্যাত্ম সাধনা, উপবাস বা ত্যাগস্বীকার এবং ভিক্ষাদান বা দয়ার কাজের মধ্য দিয়ে এই উপবাসকাল উদযাপন করব যেন আমরা আমাদের পাপ থেকে মুক্ত হতে পারি, যেন পরিত্রাণ লাভ করে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হতে পারি। এই সময় আমরা আমাদের নিজেদের পাপের ক্রুশ বহন করে যিশুর ক্রুশ বহনে সহযাত্রী পারি। আমরা কেউ সাধু নই বরং আমরা সকলেই পাপী, তা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। আমরা এই পবিত্র উপবাস বা প্রায়শ্চিত্তকালে একটা সুযোগ পেয়েছি। ঈশ্বরই আমাদের এই সুযোগ দিয়েছেন। আসুন আমরা এই সুযোগ গ্রহণ করি, আমাদের মন পরিবর্তন করি বা পাপ থেকে মন ফেরাই! আসুন আমরা ঈশ্বরের কাছে ফিরে যাই! যিশুকে অনুসরণ করি যেন তাঁর পুনরুত্থানের সহভাগী হতে পারি।

আপনাদের সেবায়,

বিশপ জের্ভাস রোজারিও

রাজশাহী

Please follow and like us: