বেনেডিক্ট তুষার বিশ্বাস

প্রায়শ্চিত্ত খ্রিস্টধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা এবং প্রায়শ্চিত্তকাল হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ যা পাপের জন্য অনুশোচনা, ক্ষমা প্রার্থনা এবং নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আমরা আমাদের প্রত্যেক দিনের জীবনে বিভিন্নভাবে পাপ করে থাকি; আমাদের কথার দ্বারা কিংবা আমাদের কাজের দ্বারা কিংবা আমাদের মনের বিভিন্ন অসৎ চিন্তা ভাবনার মধ্য দিয়ে। আর এ পাপই ঈশ্বরের সাথে আমাদের গভীর সম্পর্ক নষ্ট করে; ঈশ্বরের কাছ থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দেয়। পাপের কারণে ঈশ্বরের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হলে তা পুনঃস্থাপনের একমাত্র উপায় হলো পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা, অনুতপ্ত হওয়া ঈশ্বরের এবং মানুষের কাছে। খ্রিস্ট বিশ্বাস অনুসারে যিশু খ্রিস্ট এ জগতে এসেছিলেন মানবজাতির পরিত্রাতারূপে। যিশু খ্রিস্টের মাধ্যমে প্রায়শ্চিত্তের পূর্ণতা পাওয়া যায়, কারণ তিনি মানবজাতির পাপের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ স্বেচ্ছায় ক্রুশের ওপর নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন।

প্রায়শ্চিত্তের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
খ্রিস্টধর্মে প্রায়শ্চিত্তের মূল লক্ষ্য হলো পাপের মোচন এবং ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের আত্মার পুনর্মিলন। পবিত্র বাইবেলের ১ যোহন ১:৯ পদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “কিন্তু আমরা যদি আমাদের পাপ স্বীকার করি, তাহলে ঈশ্বর, যিনি বিশ্বস্ত ও ধর্মময়, তিনি নিশ্চয় আমাদের পাপ ক্ষমা করবেন; সমস্ত অধর্ম থেকে মুক্ত করে আমাদের শুচিশুদ্ধ করে তুলবেন।” যিশু খ্রিস্ট প্রায়শ্চিত্তের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য বিভিন্ন ধরণের উপমা ব্যবহার করতেন। সবচেয়ে পরিচিত একটি উপমা কাহিনী হলো ‘অপব্যয়ী পুত্রের উপমা’। এ গল্পে দেখা যায়, একজন যুবক তার পিতার সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ে। সম্পদের অপচয় করে এবং শেষে যখন দেখে তার এখন আর কিছুই নেই তখন সে অনুতপ্ত হয়ে পুনরায় তার পিতার কাছে ফিরে আসে। যখন সে অনুতপ্ত অন্তরে পিতার কাছে ফিরে আসে তখর তার পিতা তাকে সাদরে গ্রহণ করে মহানন্দে উৎসবের আয়োজন করেন। এই গল্পটিতে দেখা যায় যে, ছেলেটির পিতা যেমন সাদরে গ্রহণ করেছিলেন ঠিক একইভাবে স্বর্গে বিরাজমান পিতা ঈশ্বরও আমাদের প্রায়শ্চিত্ত ও অনুতাপকে সাদরে গ্রহণ এবং আমাদের ক্ষমা করতে সদা প্রস্তুত থাকেন। প্রায়শ্চিত্ত কেবলমাত্র ব্যক্তিগত মুক্তির উপায় নয় বরং এটি সামাজিক ও আত্মিক উন্নতির পথও। প্রায়শ্চিত্ত মানুষকে নৈতিকভাবে শুদ্ধ রাখে ফলে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় থাকে।

প্রায়শ্চিত্তের ধাপ ও পবিত্র বাইবেল
প্রায়শ্চিত্ত একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মতো, যা কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করা যেতে পারে।

পাপ স্বীকার: প্রথমেই নিজের পাপ স্বীকার এবং তা উপলব্ধি করে অনুতপ্ত হতে হবে। পবিত্র বাইবেল বলে, “যদি সত্যের পথে আমরা চলি, তাহলে আমরাও পরস্পরের সাথে একসঙ্গে মিলন বন্ধনে মিলিত হয়ে আছি এবং তাঁর পুত্র যীশুর রক্ত আমাদের সমস্ত পাপ মুছিয়ে শুচিশুদ্ধ করে তুলছে” (১ যোহন ১:৭)। এই স্বীকৃতি একজন খ্রিস্টবিশ্বাসী মানুষের জীবনে নতুন পরিবর্তনের সূচনা করে।

আন্তরিক অনুশোচনা: আন্তরিক অনুশোচনার জন্য শুধুমাত্র পাপস্বীকার করাটাই যথেষ্ট নয় বরং অন্তরে সত্যিকারের অনুশোচনা থাকাও খুবই জরুরি। পবিত্র বাইবেলের করিন্থিয়দের কাছে দ্বিতীয় পত্রে বলা আছে, “যে দুঃখ মানুষ ঈশ্বরের কাছ থেকে পায়, সে দুঃখ তো মনের পরিবর্তন ঘটিয়ে তাকে পরিত্রাণের পথে এগিয়ে নিয়ে আসে; সে দুঃখ পাওয়ায় মনে তো কোনো ক্ষোভ থাকে না। অর্থাৎ ঈশ্বরের কাছ থেকে আমরা যে দুঃখ-কষ্ট পেয়ে থাকি তা মূলত আমাদের নিজের ভুল বুঝতে পেরে সেখান থেকে সরে আসার একটি পন্থামাত্র।

ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা: কাথলিক বিশ্বাসে স্বীকরোক্তি বা পাপস্বীকার প্রথার প্রচলন আছে, যেখানে একজন যাজকের কাছে পাপস্বীকার করা হয় এবং যাজক ঈশ্বরের নামে পাপের ক্ষমা ঘোষণা করেন। পবিত্র বাইবেলের দ্বিতীয় বংশাবলি গ্রন্থে ঈশ্বর বলছেন, “আর সেই সময়ে আমার নামে চিহ্নিত এই জাতির মানুষেরা যদি নিজেদের নমিত করে, প্রার্থনা করে, তারা যদি আমার অনুগ্রহ পেতে প্রয়াসী হয়, তাদের কুপথ ছেড়ে ফিরে আসতে হবে; তাহলে আমি স্বর্গলোক থেকে কান পেতেই শুনবো, তাদের সকল পাপ ক্ষমা করবো এবং তাদের দেশ ব্যাধিমুক্তও করবো।

জীবন পরিবর্তন: প্রায়শ্চিত্তের শেষ ধাপ হলো জীবনের পরিবর্তন করা এবং পাপ থেকে দূরে থাকা। অনেক সময় দেখা যায়, পাপস্বীকার করার পরে কিছুদিন পরে আমরা ঠিক একই পাপ করি। সুতরাং আমার পাপস্বীকার, অনুশোচনা ও ক্ষমা-প্রার্থনা তখনই সম্পূর্ণ অর্থপূর্ণ হবে যখন এসকল ধাপের মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারবো। পবিত্র বাইবেল বলে, “এখন দূর্জন পরিত্যাগ করুক তার পথ, অধার্মিক তার যত অপকর্ম। তারা ভগবানের কাছে ফিরে আসুক, নিশ্চয় করুণা করবেন তিনি। ফিরেই আসুক আমাদের ঈশ্বরের কাছে; কেননা ক্ষমাদানে তিনি যে উদার” (ইসাইয়া ৫৫:৭)।
খ্রিস্টবিশ্বাস অনুসারে প্রায়শ্চিত্তের চূড়ান্ত রূপ পাওয়া যায় যিশু খ্রিস্টের আত্মত্যাগের মাধ্যমে। খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে অনন্ত জীবন লাভের একমাত্র উপায় হলো যিশুর দেহ ও রক্ত। যিশু নিজেই বলেছেন “আমি তো ধার্মিকদের নয়, পাপীদেরই আহ্বান জানাতে এসেছি।” অর্থাৎ, যিশু মূলত তাদেরই কাছে আসার আহ্বান জানিয়েছেন যারা নিজেদের পাপী মনে করেন এবং প্রায়শ্চিত্ত করতে চান। প্রায়শ্চিত্ত কেবল একটি এককালীন ঘটনা নয়, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ঈশ্বরের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখতে হলে আমাদের নিয়মিত প্রার্থনা, পবিত্র বাইবেল পাঠ এবং সৎ কাজ করে যেতে হবে। প্রায়শ্চিত্তকালীন সময় আমাদের ৩টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখতে হয় ১) প্রার্থনা ২) বাইবেল পাঠ ৩) সৎ কাজ ও দান।

প্রার্থনা: একজন খ্রিস্টান নিয়মিত প্রার্থনার মাধ্যমে ঈশ্বরের সাথে সংযোগ বজায় রাখতে পারে। প্রার্থনার সময় আমরা ঈশ্বরের কাছে নিজের পাপকর্মের জন্য অনুতপ্ত হই এবং দয়া প্রার্থনা করি।

পবিত্র বাইবেল পাঠ: খ্রিস্টিয় জীবনে আমাদের দৈনন্দিন নির্দেশিকা হলো পবিত্র বাইবেল। বাইবেলের শিক্ষা অনুসারে জীবন পরিচালনা করাই হলো প্রকৃত প্রায়শ্চিত্তের লক্ষণ। আমাদের প্রতিদিনের যেন এই স্লোগান হয় “No Bible, No Food”।

সৎ কাজ ও দানশীলতা: প্রায়শ্চিত্ত কেবলমাত্র অন্তরের পরিবর্তন নয়, এটি বাহ্যিক কর্মের মাধ্যমেও প্রকাশ পেতে পারে। দানশীলতা, দরিদ্রদের সাহায্য করা এবং সমাজে ভালো কাজ করা প্রকৃত প্রায়শ্চিত্তের বহিঃপ্রকাশ।

পরিশেষে বলতে চাই, খ্রিস্টধর্মে প্রায়শ্চিত্ত শুধুমাত্র না খেয়ে থাকা কিংবা অনুতপ্ত হয়ে পাপ মুক্তির উপায় নয়; কিন্তু ঈশ্বরের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি পবিত্র প্রক্রিয়া যা আমাদের অন্তর থেকে করতে হয়। যিশু খ্রিস্টের প্রতি বিশ্বাস এবং আন্তরিক অনুশোচনার মাধ্যমে একজন খ্রিস্টবিশ্বাসী তার জীবন পরিবর্তন করেন এবং ঈশ্বরের কৃপা লাভ করেন। ঈশ্বর সর্বদা ক্ষমাশীল, তবে প্রকৃত ক্ষমা পাওয়ার জন্য প্রয়োজন সত্যিকারের পরিবর্তন এবং ন্যায়ের পথে চলা।

Please follow and like us: